ছবি ও সংবাদ ইবনে বতুতার জন্মস্থানে একদিন

ইবনে বতুতার জন্মস্থানে একদিন

-

ইবনে বতুতা

আমলান দেওয়ান:
কিশোর বয়সে যার ইতিহাস পড়েছি বইয়ের পাতায়, বড়দের মুখে শুনেছি কল্পকাহিনির মতো একদিন তার জন্মশহরে যেতে পারবো ভাবিনি কখনো।
১৯৯২ সালে ছাত্রাবস্থায় ওআইসির স্কলারশিপ নিয়ে উত্তর আফ্রিকার দেশ মরক্কোতে পড়াশুনা করতে যাওয়ার সুযোগ হয়। রাজধানী রাবাতে ছিল আমার বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। কোন এক গ্রীষ্মের ছুটিতে হাজির হই মরক্কোর উত্তরের শহর তানজিরে.. যেখানে জন্ম নিয়েছিলেন ইবনে বতুতা। ১৯৯৬ সালে দেশে ফিরে সেই স্মৃতি নিয়ে লিখেছিলাম। ছাপা হয়েছিল সাপ্তাহিক খবরের কাগজ ও আরও কয়েকটি সংবাদপত্রে।
দেশ বিদেশে ঘুরতে পছন্দ করেন এমন সবার কাছে পরিচিত একটি নাম ইবনে বতুতা। পর্যটক, চিন্তাবিদ, ধর্মতাত্বিক, দার্শনিক ইবনে বতুতা ঘুরে বেড়িয়েছেন সারা বিশ্ব। আফ্রিকা থেকে ভারতবর্ষ, ভারতবর্ষ থেকে ইউরোপ। এমনকি বাংলাদেশেও এসেছিলেন তিনি। কখনো নদীপথে, কখনো উটের কাফেলায় কখনো পায়ে হেঁটে এ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি।
১৩০৪ সালের ২৪ ফেব্রয়ারি মরক্কোর তানজির শহরে তার জন্ম। পুরো নাম শেখ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ। তার পিতা ছিলেন একজন বিচারপতি। ২১ বছর বয়সে হ্জ্ব পালনের জন্য মক্কার উদ্দেশে যাত্রা করেন। শুরু হয় তার পর্যটকজীবন। বর্তমান পশ্চিম আফ্রিকার নানা দেশ ছাড়াও সৌদি আরব, সিরিয়া, ইরান, ইরাক, কাজাকিস্তান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, ভারত, শ্রীলংকা, চীন কোন দেশই তার ভ্রমনের গন্তব্য থেকে বাদ পড়েনি।
আফগানিস্তান, ভারত ও শ্রীলংকা সফর শেষে মালদ্বীপ হয়ে ইবনে বতুতা বাংলাদেশে আসেন ১৩৪৬ সালের ৯ জুলাই।
বাংলাদেশে তার ভ্রমনের বর্ণণা লিখে রেখেছিলেন তিনি।
“..টানা ৪৩ রাত সাগরে কাটিয়ে অবশেষে আমরা বাংলাদেশে পৌঁছলাম।
সবুজে ঘেরা বিশাল এক দেশ। প্রচুর চাল পাওয়া যায়। এ দেশে অল্প দামে জিনিষপত্র পাওয়া যায়। অন্য কোন দেশে এমনটি আর দেখিনি।”
প্রথম তিনি যে শহরে প্রবেশ করেন তার নাম সাতগাও বা চাঁটগাও। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে পার্বত্য এলাকায় যান। দেখা করেন সুফিসাধক শেখ জালালউদ্দিন বা হযরত শাহজালাল (র:) এর সঙ্গে। হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের উপর সুফি দরবেশদের প্রভাবের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
এরপর তিনি নদীপথে সোনারগাঁও যাত্রা করেন।
দুই মাসের মতো সময় তিনি বাংলাদেশে কাটান। বতুতা তার লেখায় বাংলার জলবায়ু, আবহাওয়া তুলে ধরেছেন। নিজে বাজারে গিয়ে জিনিষপত্রের দামের তালিকাও করেছেন। তখনকার রাজনৈতিক অবস্থার কথাও তার বর্ণনা থেকে বাদ পড়েনি। লেখা ও বর্ণনা থেকে পরিস্কার তিনি বাংলার সংস্কৃতি ও সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছিলেন।
এসব কারনেই মরক্কো পৌছার পর থেকেই ইবনে বতুতার জন্মশহর তানজির ভ্রমনের ইচ্ছা ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের মরক্কান বন্ধুদের কাছে জানতে পারলাম.. অত্যন্ত সুন্দর একটি শহর তানজির। অবস্থান মরক্কোর উত্তরে। ভূ-মধ্যসাগর আর আটলান্টিক মিলিত হয়েছে এ শহরেই। তাই এটিকে বলা হয় পৃথিবীর শেষ সীমানা। এখানেই রয়েছে গ্রীক পুরানের চরিত্র হারকিউলিসের গুহা। আটলান্টিক আর ভূমধ্যসাগর যে পয়েনেট মিলিত হয়েছে সেখানটাতেই এ গুহা।
কিন্তু আমার আগ্রহ ছিল ইবনে বতুতাকে নিয়ে। মরক্কান বন্ধুদের কাছে জানতে চাইলাম তানজিরের কোথায় ইবনে বতুতার কবর তা কি জানো? তার উত্তরসূরিদের কেউ কি এখনো আছে ঐ শহরে? অবাক বিস্ময়ে দেখলাম: ইবনে বতুতা তাদের কাছে মোটেই পরিচিত নয়। এমনকি ইবনে বতুতার নামও তারা শোনেনি। এক দুইজন নাম শুনলেও বিস্তারিত কিছু বলতে পারলো না।
আমি নাছোড়বান্দা। যে করেই হোক তানজির যাবো। খুঁজে বের করব ইবনে বতুতার বাড়িঘর, জন্মস্থান কিংবা কবর।
মরক্কোর বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তা নূরুল ইসলাম আমার ইচ্ছার কথা শুনে বললেন, তিনিও আমার সঙ্গী হতে চান। সঙ্গে নিতে চান তার স্ত্রী পুত্রদেরও। আমার জন্য ভালোই হলো। সানন্দচিত্তে সদলেবলে বাসে চেপে রওনা হলাম তানজির শহরের উদ্দেশে। কয়েক ঘন্টার ভ্রমণ শেষে আমরা পৌঁছে যাই ছোট ছিমছাম শহর তানজিরে। হোটেলে ব্যাগ তল্পিতল্পা রেখে আমরা বেরিয়ে পড়লাম।
আমি ফরাসি জানি। টুকটাক আরবিও বলতে পারি। বাইরে বেরিয়ে রাস্তায় অনেকের কাছেই ইবনে বতুতার বাড়ির গন্তব্য জানতে চাইলাম। কেউ জানাতে পারলেন না। কিন্তু হতাশ হলাম না। চেষ্টা চালিয়ে গেলাম…
অবশেষে একজন চিনতে পারলেন। কিভাবে কোনপথে যেতে হবে নির্দেশনা দিলেন। আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে এক টিলার উপর ইবনে বতুতার কবর। দু’পাশে অসংখ্য বাড়িঘর। তার মাঝখান দিয়ে টিলার দিকে উঠে গেছে সরু রাস্তা। রাস্তার শেষপ্রান্তে এসে দেখা মিললো ইবনে বতুতার কবর। ২০ ফুট বাই ২০ ফুটের ছোট একটি পাকা একতলা ঘর। তার মাঝখানে সবুজ আর লাল কাপড়ে মখমলে জরির কাপড়ে ঢাকা বতুতার কবর..
ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বের করে ছবি তুলতে চাইলে বাধা দিলেন একজন। আরবি আর ফরাসি মিশিয়ে বললেন, নিষেধ আছে। ছবি তুলবেন না। কিন্তু এতদূর এসে ছবি তোলা ছাড়াই ফেরত যাবো তাতো হয়না। অবশেষে ম্যানেজ করা হলো ঐ কেয়ারটেকারকে। তোলা হলো ছবি। কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে যেন ফিরে গেলাম ৮ শত বছর পেছনে-যখন ইবনে বতুতা পা ফেলেছিলেন আমার জন্মভূমি চট্রগ্রামে..আর বাংলাদেশে….

( লেখকের পর্যটক বন্ধু তানভীর অপুর জন্মদিনে উৎসর্গকৃত লেখা)

লেখক : সাংবাদিক ও সমাজকর্মী (প্রবাসী)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ সংবাদ

মিয়ানমার থেকে ঢুকেছে ২৮ হাজার টন পেঁয়াজ

নিউজবাংলা ডেস্ক: এ মুহূর্তে দেশে পেঁয়াজের পর্যাপ্ত মজুদ আছে। বাজারেও সরবরাহ যথেষ্ট। এছাড়া রোববার মিয়ানমার থেকে ২৮ হাজার টন পেঁয়াজ...

রাতের আঁধারে কালীগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবনটি যেন ভূতের বাড়ি

হুমায়ুন কবির, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি : ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার প্রাণকেন্দ্র মেইন বাসস্ট্যান্ড সংলগ্নে মুক্তিযোদ্ধা ভবনটি অবস্থিত।২০১৪ সালে ভবনটি নির্মান করা...

কোভিড-১৯ মোকাবেলায় বৈশ্বিক কর্মপরিকল্পনা নেয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

নিউজবাংলা ডেস্ক: জলবায়ু পরিবর্তন ও কোভিড-১৯ মহামারী থেকে উদ্ভূত সংকট মোকাবেলায় ঐক্যবদ্ধ বৈশ্বিক কর্মপরিকল্পনা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি...

করোনা রোধে ম্যার্কেলের জরুরি বৈঠকের ডাক

সরাফ আহমেদ সেপ্টেম্বর মাসের শুরু থেকে জার্মানিতে ক্রমান্বয়ে করোনা সংক্রমণের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকায় চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল সঙ্কট মোকাবিলায় সমন্বিত...

ওমরাহ চালুর ঘোষণা সৌদি আরবের

নিউজবাংলা ডেস্ক: করোনা মহামারীর কারণে দীর্ঘ দিন ধরেই মসজিদুল হারামে জন সাধারণের প্রবেশে সীমিত রেখেছে সৌদি আরব। বন্ধ রাখা হয়েছে...

ভ্যাকসিন ‘দখলে’ পার্শ্বচুক্তির নিন্দায় জাতিসংঘ মহাসচিব

নিউজবাংলা ডেস্ক: বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস সংক্রমণের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের কথা না ভেবে শুধু নিজেদের লাভের জন্য ভ্যাকসিন সংগ্রহে...

Must read

মিয়ানমার থেকে ঢুকেছে ২৮ হাজার টন পেঁয়াজ

নিউজবাংলা ডেস্ক: এ মুহূর্তে দেশে পেঁয়াজের পর্যাপ্ত মজুদ আছে। বাজারেও...

রাতের আঁধারে কালীগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবনটি যেন ভূতের বাড়ি

হুমায়ুন কবির, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি : ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার প্রাণকেন্দ্র...

আপনার পছন্দের সংবাদRELATED
Recommended to you