সাহিত্য সুনীল কথামালা

সুনীল কথামালা

-

ইমদাদুল হক মিলন

স্কুলজীবনের শেষ পরীক্ষা হয়ে গেছে। হাতে অখণ্ড সময়। স্কুল মাস্টার বাবা ছেলেকে একটা কাজ দিলেন। ইংরেজি কবিতার অনুবাদের কাজ। ঘরে বসে এই সব কবিতা অনুবাদ করতে করতে সমবয়সী এক বান্ধবীর উদ্দেশে নিজেই একটি কবিতা লিখে ফেলল সেই ছেলে। কবিতার নাম ‘একটি চিঠি’। ডাকে পাঠিয়ে দিল বিখ্যাত ‘দেশ’ পত্রিকায়। কিছু না বুঝেই পাঠানো। কবিতাটি ছাপাও হলো। ১৯৫১ সালের ৩১ মার্চ সংখ্যা ‘দেশ’ পত্রিকায় যে ছেলেটির এই কবিতা ছাপা হলো তাঁর নাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। বাংলা ভাষার বিখ্যাত এবং জনপ্রিয় লেখক। সাহিত্যের সব শাখায় কমবেশি বিচরণ করেছেন। কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনি, রস রচনা, নাটক, প্রবন্ধ আর বিপুল শিশু-কিশোর সাহিত্য। সব মিলিয়ে প্রকৃতই সব্যসাচী লেখক। তাঁর সময়কার সবচেয়ে বড় সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম ৭ সেপ্টেম্বর ১৯৩৪। বাংলাদেশের মাদারীপুরের লোক। গ্রামের নাম মাইজপাড়া। ছেলেবেলায় কিছুদিন এই গ্রামে কাটিয়েছেন। তারপর কলকাতায়। টিউশনি দিয়ে জীবিকা শুরু। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ। দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে আর আসেননি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এ দেশের সাহিত্যপ্রেমী মানুষ তাঁকে গভীরভাবে ভালোবেসেছে। ’৬০ এর দশক থেকে বেলাল চৌধুরী তাঁর ঘনিষ্ঠ সহচর। বেলাল ভাই ছিলেন অসাধারণ বাউণ্ডুলে এক চরিত্র। ‘৬০ এর দশকের শুরুর দিকে কুমির শিকারের জাহাজে চড়ে কলকাতায় গিয়ে নেমেছিলেন। ভিড়েছিলেন সুনীলদের দলে। বহু বহু বছর পূর্ব পাকিস্তানে ফেরা হয়নি তাঁর।

কিন্তু মাইজপাড়া গ্রামটির জন্য সুনীলের মন বড় কাঁদত। ’৯০ সালের মাঝামাঝি সেই গ্রামের এক ভদ্রলোক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়দের পৈতৃক ভিটা উদ্ধার করলেন। তাঁর নাম আবদুর রাজ্জাক হাওলাদার। থাকেন আমেরিকায়। সুনীলদার মহা অনুরাগী। বাড়ি উদ্ধার করে সেখানে একটি পাঠাগার করলেন। প্রতিবছর সুনীলদার জন্মদিনে দুই দিনব্যাপী ‘সুনীল মেলা’ হয় এখন মাইজপাড়া গ্রামে। বেশ কয়েকবার সুনীলদা সেখানে এসেছেন। বাড়ির আঙিনায় দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছেন। দেশভাগের বেদনা তাঁকে আচ্ছন্ন করে রাখত। তাঁর বিশাল উপন্যাস ‘পূর্ব-পশ্চিম’ পড়লে এই হাহাকার টের পাওয়া যায়। বিক্রমপুরের মালখানগর গ্রামটি এই উপন্যাসের অনেকখানি জুড়ে আছে। উপন্যাসের এক চরিত্র অতীন মালখানগরের। দেশভাগের ফলে সেই গ্রাম ফেলে উদ্বাস্তু হয়ে চলে গিয়েছিল কলকাতায়। মা মৃত্যুশয্যায়, ছেলে মাকে বলছে—‘তোমার শেষ ইচ্ছে কী?’ মা বললেন, ‘আমাকে মালখানগরে নিয়ে যা।’ এই একটি বাক্যে দেশপ্রেমের গভীর টান উপলব্ধি করা যায়।
এই মালখানগর বাংলা সাহিত্যের আরেক বিখ্যাত লেখকের গ্রাম। তাঁর নাম বুদ্ধদেব বসু। বেশ কাছেই আরেক গ্রাম ‘মালপদিয়া’ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গ্রাম। তাঁর মামাবাড়ির গ্রাম ‘গাওদিয়া’। এই গ্রামের পটভূমিতে লেখা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’।

দেশভাগের ভয়ংকর সব ঘটনা এবং উদ্বাস্তু হয়ে কলকাতার উপকণ্ঠে আশ্রয় নেওয়া পূর্ববঙ্গের ছিন্নমূল মানুষদের নিয়ে সুনীলদা লিখেছিলেন ‘অর্জুন’ নামের দুর্দান্ত এক উপন্যাস।

সেই যে বান্ধবীর উদ্দেশে চিঠির আকারে লেখা কবিতা, এই যে শুরু, তারপর ধীরে ধীরে জড়াতে লাগলেন সাহিত্যজগতে। কফি হাউসের আড্ডা, হৈ-হল্লা, সম্পূর্ণ বোহেমিয়ান জীবন, অবিরাম লিখে যাওয়া এবং পত্রিকা প্রকাশ ইত্যাদিতে এমনভাবে জড়ালেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, এক জীবনে সেখান থেকে আর বেরোতে পারেননি। ‘এক জীবনে’ নামে তাঁর একটি উপন্যাসও আছে। তাঁর আত্মজীবনীর নাম ‘অর্ধেক জীবন’। এক সন্ধ্যায় আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘অর্ধেক জীবন’ নাম দিলেন কেন? মৃদু হেসে বললেন, ‘জীবনের সব কথা তো লিখতে পারিনি! বাঙালি লেখক হিসেবে লেখা সম্ভবও না। অর্ধেক লিখেছি, বাকি অর্ধেক স্মৃতিতে চাপা পড়ে রইল।’

স্বাধীনতার পর থেকেই আমাদের প্রজন্মকে পাগল করে দিয়েছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁর কবিতা আমাদের মুখে মুখে ফিরত। গল্প-উপন্যাস নিয়ে তুমুল আলোচনায় এবং মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন থাকতাম। ‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতাটি কবিতা পাঠের অনুষ্ঠান মাতিয়ে রাখত। ‘যদি নির্বাসন দাও’ কবিতার সেই দুটি লাইন—‘বিষণ্ন আলোয় এই বাংলাদেশ, এ আমারই সাড়ে তিনহাত ভূমি’ আমাদের রক্তে দোলা লাগিয়েছে। প্রেমিক-প্রেমিকাদের মুখে মুখে ফিরছে ‘ভ্রু পল্লবে ডাক দিলে, দেখা হবে চন্দনের বনে’। এই কবিতাটি লেখার ইতিহাস সুনীলদা লিখেছেন। মধ্যরাতে একাকী বসে আছেন এক অচেনা স্টেশনে। তীব্র শীত। হঠাত্ একটি লাইন তাঁর মনে এলো। ‘ভ্রু পল্লবে ডাক দিলে, দেখা হবে চন্দনের বনে’। এই লাইনটি ভেবে সেই তীব্র শীতে উষ্ণ হয়ে উঠেছিলেন কবি।

সুনীলদের সেই সব উন্মত্ত দিনে তাঁর আরেক কবিবন্ধু শরত্কুমার মুখোপাধ্যায় লিখলেন, ‘মধ্যরাতে কলকাতা শাসন করে চার যুবক।’ এই চার যুবক কে কে? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শরত্কুমার মুখোপাধ্যায় আর আমাদের বেলাল চৌধুরী। পুলিশে ধরেছে কত রাত, কবরখানায় শুয়ে থেকেছেন, ধলভূমগড় নাকি চাইবাসা বেড়াতে গিয়ে বদ্ধ মাতাল হয়ে খোলা মাঠে ঘুমিয়ে পড়েছেন সদলে। সকালবেলা গ্রামের মানুষ চারদিক থেকে ঘেরাও করেছিল ডাকাত ভেবে মেরে ফেলার জন্য। এ রকম কত দুঃসাহসিক ঘটনা লুকিয়ে আছে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জীবনের পরতে পরতে।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে আমি প্রথম দেখলাম ১৯৭৪ সালে। ফেব্রুয়ারি মাসে সেবার একটি সাহিত্য সম্মেলন হলো বাংলা একাডেমিতে। উদ্বোধন করলেন বঙ্গবন্ধু। অন্নদাশঙ্কর রায়ের নেতৃত্বে কলকাতার একদল লেখক-কবি এলেন ঢাকায়। ২১শে ফেব্রুয়ারি সকালবেলায় কবিতা পাঠের অনুষ্ঠান। সভাপতিত্ব করছেন বেগম সুফিয়া কামাল। সেই অনুষ্ঠানে শক্তি চট্টোপাধ্যায় পড়লেন ‘অবনী বাড়ি আছ’ কবিতাটি। সুনীলদা প্রথমে একটি কবিতা পড়লেন। তারপর বেগম সুফিয়া কামালের অনুরোধে পড়লেন ‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতাটি। প্যান্টের ওপর চেকের হাওয়াই শার্ট পরা। স্বাস্থ্যবান টগবগে একজন মানুষ। দেখে লেখক-কবি মনেই হয় না। আমি তত দিনে তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘আমি কী রকমভাবে বেঁচে আছি’ পড়ে ফেলেছি। ‘জীবন যেরকম’ উপন্যাসটি পড়েছি। আর ‘দেশ’-এ ধারাবাহিকভাবে পড়ছিলাম ‘একা এবং কয়েকজন’। ‘দেশ’ পত্রিকায় কিছু গল্প পড়েছি। ‘সনাতন পাঠক’ নামের কলামটি নিয়মিত পড়ি। ‘নীললোহিত’ ছদ্মনামের লেখাগুলো পড়ি। তখনো তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় উপন্যাস ‘আত্মপ্রকাশ’ ও ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ পড়া হয়নি। ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকাটি নিয়মিত পড়ি। এই পত্রিকা ঘিরে যে লেখক-কবির দল তাঁদের প্রত্যেকের সম্পর্কেই ধীরে ধীরে জানছি।

সুনীলদার সঙ্গে পরিচয় হলো আরো চার বছর পর ’৭৮ সালে। ঢাকায় এসে তিনি উঠেছিলেন গাজী শাহাবুদ্দিন, মানে আমাদের মনু ভাইয়ের বাড়িতে। জোনাকী সিনেমা হলের পাশেই বাড়ি। নিচতলায় মনু ভাইয়ের পত্রিকা ‘সচিত্র সন্ধানী’র অফিস। নতুনভাবে পত্রিকাটি বেরোবার তোড়জোড় চলছে। আগে মাসিক পত্রিকা হিসেবে বেরোত। সেখানে সৈয়দ শামসুল হক লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘খেলারাম খেলে যা’। সেবার সুনীলদার সঙ্গে ‘দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক সাগরময় ঘোষও ছিলেন। ইত্তেফাক ভবন থেকে সাপ্তাহিক ‘রোববার’ বের করার চেষ্টা চলছে। সেই পত্রিকায় জুনিয়র রিপোর্টার হিসেবে জয়েন করেছি। রোববারের পক্ষ থেকে ঢাকা ক্লাবে পার্টি দেওয়া হলো। সাগরময় ঘোষ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শামসুর রাহমান, রশীদ করীম, রফিক আজাদ, রাহাত খানের সঙ্গে আমিও ছিলাম। তারপর কত নিবিড় পরিচয় সুনীলদার সঙ্গে। বাংলাদেশ কলকাতা মিলিয়ে কত আনন্দসন্ধ্যা একসঙ্গে কাটানো। নিউ ইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেসে একসঙ্গে দিন কাটানো।
’৯৬-এর ইলেকশনে সুনীলদা এলেন ইলেকশন অবজারভার হয়ে। তাঁর সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে যুক্ত করা হলো আমাকে। একসঙ্গে চার দিন বরিশালে কাটালাম। জীবনানন্দ দাশের ধানসিড়ি নদী খুঁজে একদিনের অর্ধেক সময় চলে গেল। আশ্চর্য ব্যাপার, এলাকার লোকজন নদীটি চিনতেই পারছিল না। সেই নদীতে ঘণ্টাদুয়েক ঘুরে বেড়ানো। সারাটাক্ষণ সুনীলদা উদাস হয়ে থাকলেন। বরিশালের সবচেয়ে ভালো হোটেলে একটি রুম পেয়েছিলাম আমরা। পাশাপাশি দুটি বিছানা। ঘুমাবার আগে সুনীলদা বললেন, ‘আমি কিন্তু খুব নাক ডাকি। তুমি ঘুমাতে পারবে তো?’

ভাবলাম, কী আর নাক ডাকবেন সুনীলদা! নিশ্চয়ই ঘুমাতে পারব। তখনো কল্পনা করিনি কাণ্ডটা কী হতে যাচ্ছে। শোয়ার এক মিনিটের মধ্যে ঘুমিয়ে গেলেন সুনীলদা। তারপর শুরু হলো তাঁর নাক ডাকা। বাপ রে! নাক ডাকা কাহাকে বলে! আমার একসময় মনে হলো সুনীলদার নাক ডাকার শব্দে বরিশাল শহরের সব মানুষ জেগে যাবে। কলকাতায় ফিরে গিয়ে এই ভ্রমণ নিয়ে ‘দেশ’ পত্রিকায় সুনীলদা একটি লেখা লিখেছিলেন ‘ধানসিড়ি নদীর সন্ধানে’। পরে আনন্দ পাবলিশার্স থেকে বই বেরোয় ‘ধানসিড়ি নদীর সন্ধানে ও অন্যান্য’ নামে।

ঢাকায় সৈয়দ আল ফারুক আর তাঁর স্ত্রী নাহিদ নাজিয়া, তার ডাক নাম বীথি, বীথির বাড়িতে সুনীলদাকে নিয়ে অনেক সন্ধ্যা আমরা কাটিয়েছি। বীথি খুব ভালো গান করে। তার গানে-গল্পে জমে থাকত আড্ডা। কলকাতার আবৃত্তিকার সৌমিত্র মিত্র আর তাঁর স্ত্রী মুনমুন থাকত। অনুষ্ঠানের সব শেষ আকর্ষণ সুনীলদার গান। একটু টিপসি হয়ে উদাত্ত গলায় গান ধরতেন সুনীলদা। ‘তুই লাল পাহাড়ের দেশে যা, রাঙ্গামাটির দেশে যা, হিথায় তোকে মানাইছে না গো ‘ইক্কেবারে মানাইছে না গো’। ‘ইক্কেবারে’ শব্দটায় এমন জোড় দিতেন, শুনে আমরা হৈ হৈ করে উঠতাম।

সুনীলদা প্রথম উপন্যাস লিখলেন ১৯৬৫ সালে। কবি হিসেবে খ্যাতিমান হয়ে উঠছেন। টুকটাক গদ্য রচনা করেন। ‘দেশ’ পত্রিকায় ফিচার জাতীয় লেখা লেখেন পয়সার জন্য। সম্পাদক সাগরময় ঘোষ ডেকে বললেন, এবারের ‘দেশ’ পুজো সংখ্যায় তুমি উপন্যাস লিখবে। সুনীলদার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। তিনি সর্বগ্রাসী পাঠক। পড়েন সব কিছুই। বাংলা সাহিত্য ও পৃথিবীর সাহিত্যের বহু ভালো উপন্যাস পড়ে ফেলেছেন। কিন্তু উপন্যাস লেখার কথা ভাবেননি কখনো। কবিতা নিয়ে আছেন, নিজের ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকা নিয়ে আছেন আর ব্যাপক আড্ডা-ঘোরাঘুরি তো আছেই। কিন্তু সাগরময় ঘোষের কথা তো ফেলা যাবে না। তিন মাস সময় দিয়েছেন। সুনীলদা প্রতিদিন সকালে কাগজ-কলম আর চা নিয়ে বসেন। এক লাইনও লেখা এগোয় না। কী নিয়ে উপন্যাস লিখবেন, তাই ঠিক করতে পারছেন না। একটি একটি করে দিন যাচ্ছে। প্রায় আড়াই মাস চলে গেল। সময় ফুরিয়ে আসছে। প্রবল অস্থিরতা নিয়ে ঘুম থেকে ওঠেন। চা নিয়ে চেয়ার-টেবিলে বসেন। মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়। লেখা হয় না এক লাইনও। এ রকম একদিন সকালবেলায় শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ছোট ভাই এসে খুবই রাগ করে বলল, ‘এসব আপনারা কী শুরু করেছেন? দাদা কাল রাতে বাড়ি ফেরেনি।’

সুনীলদা উপন্যাসের আইডিয়া পেয়ে গেলেন। নিজেদের ওই সময়কার জীবনযাত্রা নিয়েই উপন্যাস লিখবেন। টানা ১৫ দিনে লিখলেন তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘আত্মপ্রকাশ’। পাণ্ডুলিপি সাগরময় ঘোষের হাতে পৌঁছে দিয়ে কলকাতা থেকে উধাও হয়ে গেলেন। কারণ তাঁর ধারণা, এটা উপন্যাস হয়নি। তিনি ‘দেশ’ পত্রিকা ডুবিয়ে দিয়েছেন। পুজো সংখ্যা বেরোল। তারও কয়েক দিন পর ভয়ে ভয়ে কলকাতায় ফিরলেন। কোথাও নিজের লেখা নিয়ে কিছু শুনছেন না। একদিন সাহস করে গেলেন ‘আনন্দবাজার’ অফিসে। লিফটে দেখা হলো রমাপদ চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘তোমার উপন্যাস পড়তে শুরু করেছি। শেষটা যদি ভালো না হয় তাহলে খুন করে ফেলব।’

সুনীলদা একটু সাহস পেলেন। তারপর তো সাড়া ফেলে দিল ‘আত্মপ্রকাশ’। একেবারেই নতুন আঙ্গিকে নতুন ধরনের উপন্যাস। দ্বিতীয় উপন্যাস ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’। ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকা ছাপা হয়ে পড়ে আছে প্রেসে। পয়সার অভাবে ছাড়াতে পারছেন না। মাসিক ‘জলসা’ পত্রিকা উপন্যাস চাইল সুনীলদার কাছে। ওই প্রেসে বসে বসে টানা কয়েক দিন ধরে লিখলেন ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’। সেই উপন্যাস এগিয়ে গেল আরো কয়েক ধাপ। সত্যজিত্ রায় সিনেমা করে আন্তর্জাতিক মহলে পৌঁছে দিলেন। সুনীলদার ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ উপন্যাসটি নিয়েও সিনেমা করলেন সত্যজিত্ রায়। উপন্যাসের নায়কের প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছে কলকাতা শহর।

তারপর কত লেখা সুনীলদার! পুজো সংখ্যায় কবিতা-গল্প লিখছেন। ‘দেশ’, ‘আনন্দবাজার’ ও ‘আনন্দমেলা’ সর্বত্রই লিখতে হচ্ছে। একই হাউসের এতগুলো পত্রিকায় একই নামে লেখা ঠিক হবে না দেখে ‘নীললোহিত’ নামও ধারণ করলেন। এই নামে আগে এদিক-ওদিক নানা রকমের গদ্য লিখতেন। তত দিনে ‘দেশ’ পত্রিকায় জয়েন করেছেন। ‘সনাতন পাঠক’ ছদ্মনামে সাহিত্যের কলাম লিখছেন। বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে লিখে তুলকালাম কাণ্ড বাধিয়ে দিলেন। বঙ্কিমচন্দ্রকে তিনি সাম্প্রদায়িক বললেন। লেখক-পাঠক মহলে ব্যাপক ক্ষোভ।

নীললোহিত নামে প্রথম উপন্যাস লিখেছিলেন ‘আনন্দলোক’ পত্রিকায়। উপন্যাসের নাম ‘ছবিঘরে অন্ধকার’। স্কলারশিপ নিয়ে চলে গিয়েছিলেন আইওয়ায়। সেখানে পরিচয় হয়েছিল ফরাসিনী মার্গারিটের সঙ্গে। গভীর প্রেম। মার্গারিট ঘুরেফিরে তাঁর অনেক লেখায় এসেছে। তাকে নিয়ে উপন্যাস লিখেছিলেন ‘সুদূর ঝর্ণার জলে’। অসামান্য এক প্রেমের উপন্যাস। স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায়কে ভালোবেসেই বিয়ে করেছেন। স্বাতীদির পরিবার বনেদি ও অর্থশালী। এ রকম বোহেমিয়ান কবি লেখকের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিতে চায়নি পরিবার। তার পরও বিয়ে হলো। একমাত্র ছেলের ডাকনাম ‘পুপলু’। ভালো নাম সৌভিক গঙ্গোপাধ্যায়। সে ইঞ্জিনিয়ার। টরন্টোতে থাকে। বাংলাদেশের রংপুরের মেয়ে তার স্ত্রী।

স্বাতীদি এক অসামান্য মানুষ। স্নিগ্ধ সুন্দর হাসিমুখের মানুষটি দুই বাহু দিয়ে আগলে রেখেছেন সুনীলদাকে সারাটি জীবন। কত সামান্য জিনিসে স্বাতীদিকে বিস্মিত হতে দেখেছি। অতি মায়াময় চরিত্র।

সুনীলদার কথা কত বলব, ফুরাতেই তো চায় না। ‘সেই সময়’, ‘পূর্ব-পশ্চিম’ আর ‘প্রথম আলো’—এই তিন মহা উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের স্থায়ী সম্পদ। ‘একা এবং কয়েকজন’ উপন্যাসটি তিনি উত্সর্গ করেছিলেন কমলকুমার মজুমদারকে। বইটি সাইজে বেশ মোটা। উত্সর্গপত্রে লিখেছিলেন, ‘আপনার খাটের পায়া যদি নড়বড়ে হয়ে যায় তাহলে এই বইটি সেই পায়ার তলায় দিয়ে রাখবেন।’ কমলকুমার সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য ছিল, ‘কমলকুমার মজুমদার হচ্ছেন বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বড় ধাঁধা’। আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত কমলকুমার মজুমদারের ‘গল্প সমগ্র’ ও ‘উপন্যাস সমগ্র’র ভূমিকা লিখেছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। কত বইয়ের যে ভূমিকা লিখেছেন, বলে শেষ করা যাবে না। কত বই যে সম্পাদনা করেছেন। হাসান আজিজুল হকের সঙ্গে যৌথভাবে সম্পাদনা করেছেন ‘দুই বাংলার ভালোবাসার গল্প’। আমার সঙ্গে করেছেন তিনটি কিশোর গল্পের সংকলন। একজন লেখক এত কাজ করেন কিভাবে? তাঁর বইয়ের সংখ্যা প্রায় ৪০০। কিশোর পাঠকরা ‘সন্তু ও কাকাবাবু’র জন্য পাগল। এক কিশোর পাঠক একবার চিঠি লিখে সুনীলদাকে বলেছিল, জ্ঞআপনি অন্য কিছু লিখবেন না। শুধু ‘সন্তু ও কাকাবাবু’ লিখুন।” তাঁর কিশোর উপন্যাস বড়রাও মন্ত্রমুগ্ধের মতো পড়ে। ‘সন্তু ও কাকাবাবু’র অ্যাডভেঞ্চার ছাড়া আনন্দমেলার পুজো সংখ্যা ভাবাই যেত না। আনন্দ পাবলিশার্স খণ্ডে খণ্ডে প্রকাশ করেছে ‘কাকাবাবু সমগ্র’। ‘নীললোহিত সমগ্র’ও বেরিয়েছে। বহু আগে পাঁচ খণ্ডে বেরিয়েছিল তাঁর ‘গল্প সমগ্র’। প্রকাশক ‘বিশ্ববাণী’। এখন আনন্দ পাবলিশার্স থেকে বেরোচ্ছে তাঁর ‘উপন্যাস সমগ্র’। চৌদ্দ খণ্ড বেরিয়ে গেছে। ‘কবিতা সমগ্র’ও বের করেছে আনন্দ।

সুনীলদার কথা ভাবলে বিস্ময়ের শেষ থাকে না। দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করছেন, ‘বুধসন্ধ্যা’ নামের ক্লাব চালাচ্ছেন। সন্ধ্যার পর কখনো কলম ধরতেন না। তখন শুধু আড্ডা আর পানাহার। লিখতেন সকালবেলায়, দুপুরের দিকে যেতেন ‘দেশ’ পত্রিকার অফিসে। সেখানে করতেন কবিতা বাছাইয়ের কাজ। আমি একদিন তাঁর টেবিলে বসে আছি। করিডর দেখিয়ে বললেন, ‘ওই দেখো, একজন নায়িকা যায়।’ তাকিয়ে দেখি অপর্ণা সেন হেঁটে যাচ্ছেন। অপর্ণা সেন তখন ‘সানন্দা’ পত্রিকার সম্পাদক।

সুনীলদা ভ্রমণকাহিনি লিখলেন ‘রাশিয়া ভ্রমণ’। দুই জার্মানি যেদিন একত্র হচ্ছে সেদিন তিনি বার্লিনে। ফিরে এসে লিখলেন ‘ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গ’। তাঁর অসামান্য ভ্রমণকাহিনি ‘ছবির দেশে কবিতার দেশে’। বাংলা সাহিত্যে এই বইটির কোনো তুলনা নেই। এই বইটির মধ্য দিয়ে ফরাসি দেশটা, সেই দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য আর বিখ্যাত শিল্পী-কবিদের অনুপুঙ্খ জানা যায়। কী যে আকর্ষণীয় ভাষায় লেখা! তার আগে আমেরিকা ভ্রমণ নিয়ে নীললোহিত নামে লিখেছিলেন ‘তিন সমুদ্র সাতাশ নদী’।

নকশাল আন্দোলন যখন তুঙ্গে, বড় লেখকরা প্রায় সবাই সেই আন্দোলন নিয়ে উপন্যাস-গল্প লিখছেন, সুনীলদা তখন হাঁটলেন একেবারে উল্টো পথে। তিনি চলে গেলেন পুরাণের দিকে। লিখলেন রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকাহিনি ‘রাধা কৃষ্ণ’। ভাষা ও আঙ্গিক মিলিয়ে এই উপন্যাসটির তুলনা হয় না। রবীন্দ্রনাথ ও লেডি রানু মুখার্জিকে নিয়ে লিখলেন ‘রানু ও ভানু’। আদিম যুগের মানুষ নিয়ে লিখলেন ‘আমিই সে’। ব্যেধিসত্যকে নিয়ে লিখলেন ‘নবজাতক’। কত রকমের এক্সপেরিমেন্ট করেছেন উপন্যাসে। ‘মায়াকাননের ফুল’ উপন্যাসটি লিখেছিলেন, যে উপন্যাসের কোনো বাক্যেই ক্রিয়াপদ ছিল না। ‘স্বপ্ন লজ্জাহীন’ নামে কত আগে লিখেছিলেন আরেক অদ্ভুত উপন্যাস। ‘স্বর্গের নিচে মানুষ’, ‘কালো রাস্তা সাদা বাড়ি’, ‘তুমি কে’, ‘সংসারে এক সন্ন্যাসী’—এ রকম কত উপন্যাস। ‘মহাপৃথিবী’, ‘রাতপাখি’, ‘গরম ভাত অথবা নিছক ভূতের গল্প’, ‘দেবদূত অথবা বারো হাটের কানাকড়ি’, ‘শাজাহান ও তার নিজস্ব বাহিনী’—এ রকম কত অবিস্মরণীয় গল্প। ‘গরম ভাত অথবা নিছক ভূতের গল্প’ হিন্দি ভাষায় সিনেমা হয়েছিল। নাম ‘গরম ভাত’। ছোটদের প্রথম উপন্যাস লিখেছিলেন ‘ডুঙ্গা’। ডুঙ্গা ছিল একটা কুকুরের নাম। ‘পাহাড় চূড়ায় আতঙ্ক’, ‘খালি জাহাজের রহস্য’, ‘সবুজ দ্বীপের রাজা’—এ রকম দশটি উপন্যাস নিয়ে ‘দশটি কিশোর উপন্যাস’ নামে তাঁর একটি সংকলন আছে। এসব লেখা ‘সন্তু ও কাকাবাবু’ সিরিজের বাইরে।

ঢাকায় এলে হুমায়ূন আহমেদের ফ্ল্যাটে অন্তত একটি সন্ধ্যা কাটাতেন সুনীলদা। হুমায়ূন আহমেদ ঠিক করলেন সাত পর্বে সুনীলদার একটি ইন্টারভিউ করাবেন আমাকে দিয়ে। তিনি পরিচালক। দুটি পর্ব বোধ হয় রেকর্ড করা হয়েছিল। তারপর কাজটা আর এগোয়নি। সুনীলদা সময় দিতে পারেননি। সেই পর্ব দুটি কোথায় আছে কে জানে।

হুমায়ূন আহমেদ চলে যাওয়ার পর এক রাতে স্বপ্ন দেখি, সুনীলদা আর আমি একটি সরু পাহাড়ি নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আছি। ওপারে নিবিড় বনভূমি, তারপর পাহাড়। নদীতে হাঁটুজল। সুনীলদা কোনো কথা না বলে সেই নদী পেরিয়ে ওপারে গেলেন। আমি এপার থেকে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছি। ওপারে গিয়ে তিনি একবারও ফিরে তাকালেন না। ধীরপায়ে বনভূমির ভেতর মিলিয়ে গেলেন। তার কয়েক দিন পর সুনীলদা চলে গেলেন। তারিখটা ২৩ নভেম্বর ২০১২। বাথরুমে হার্ট অ্যাটাক করেছিল, সেখানেই পড়ে গিয়েছিলেন।

সুনীলদার একটি উপন্যাসের নাম ‘নদীর ওপার’। কোন অচিন নদীর ওপারে চলে গেছেন আমাদের প্রিয় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ সংবাদ

কভিড-১৯, শিক্ষাঙ্গন ও শিক্ষকতা

ড. এ. কে. এনামুল হক বহুদিন ঘর থেকে বের হইনি। ভাবলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে দেখি কেমন আছে আমাদের ক্যাম্পাস। যখন পৌঁছলাম তখন বেলা ১টা হবে। পরিচিত কোনো কোলাহল নেই। শিক্ষার্থীবিহীন ক্যাম্পাস দেখতে ভুতুড়েই মনে হলো। ডিপার্টমেন্টে গিয়ে দেখতে পেলাম অফিসের লোকজন এসেছে। তারা পালাক্রমে আসে। যেন একসঙ্গে ভিড় না হয়। দূরত্ব বজায় থাকে। তারাই জানাল মাঝে মাঝে শিক্ষকরাও আসেন। যে যার মতো। কাজ করে চলে যান। বুঝতে পারলাম ক্যাম্পাসের মায়া না থাকলে শিক্ষক হওয়া যায় না। তাই সবাই কোনো না কোনো ছুতায় মাঝে মাঝেই আসেন। আমরা চারজন একটি বই লিখছি। প্রায় এক বছর হলো। চারজন চার দেশে থাকি। একজন থাকেন ওহাইওতে। সেখানে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। অন্যজন গোয়ায়। ভারতের গোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। অন্যজন নেপালে। হঠাৎ করেই স্প্রিংজার নেচার বইটি প্রকাশ করতে চুক্তিবদ্ধ হওয়ায় আমরা প্রতি সপ্তাহে অন্তত ঘণ্টাখানেক সময় জুম দিয়ে কথা বলি। তাই ভাবলাম, তারাও কি ক্যাম্পাসে যায়? জিজ্ঞেস করি। ওহাইওর অবারলিনের বন্ধুটিকে জিজ্ঞেস করলাম। ক্যাম্পাসে যাও? জানাল, সেও যায়। মাঝে মাঝেই। অবারলিন একটি ছোট শহর। তাই সেখানে খুব একটা লোকসমাগম নেই। ক্যাম্পাস বন্ধ। আমাদের মতোই তারাও অনলাইন ক্লাস করে। জুম অ্যাপটি ব্যবহার করে। ছাত্রছাত্রীরা ক্যাম্পাসে নেই। জানাল যে ক্যাম্পাসে তারা কারো সঙ্গে দেখা হলে দূর থেকেই হাত তোলে স্বাগত জানায়। ধারেকাছে কেউ ঘেঁষে না। কথা বলতে হলে ফোনে কথা বলে। যদিও তার সহকর্মীটি হয়তোবা পাশের কক্ষেই বসে আছে। ক্যাম্পাস খোলার কি লক্ষণ আছে? জানাল ছাত্রছাত্রীদের ভিসা সমস্যা সমাধানের জন্য তারা ক্যাম্পাসে ক্লাসের ব্যবস্থা নিচ্ছে। নচেৎ অনেকেরই যুক্তরাষ্ট্রে থাকার ভিসা রইবে না। কীভাবে করবে? প্রথমত, আমরা প্রত্যেক শিক্ষক, কর্মচারীদের প্রতি দুদিন অন্তর করে কভিড টেস্ট করাচ্ছি। দেখছি ক্যাম্পাসে কভিড রোগী রয়েছে কিনা। আমাদের পলিসি হলো, ক্যাম্পাসে কভিড পজিটিভ শূন্য হলে তবেই ক্যাম্পাস খুলবে। এখন পর্যন্ত তা হয়নি। সর্বশেষ দুজনকে পাওয়া গেছে। তবে ক্যাম্পাসে নতুন প্রোটোকল ঘোষণা হয়েছে। কী রকম? ক্যাম্পাসে আসা না-আসাটা ছাত্রদের নিজস্ব ব্যাপার। কারণ তাদের কভিড হলে বিপদ। দ্বিতীয়ত, বিভাগভেদে সপ্তাহে অন্তত একটি ক্লাস ক্যাম্পাসে নেয়ার চেষ্টা হবে। তাও হবে সীমিতসংখ্যক ছাত্রের উপস্থিতিতে। কারণ শিক্ষার্থীরা একত্রে হলেই জটলা করবে। তখন সারা ক্যাম্পাসে তা ছড়িয়ে পড়তে পারে। এটাই বিপদ। আবার যারা হোস্টেলে থাকবে তাদের প্রত্যেককে আলাদা রুমে রাখার চেষ্টা চলছে। ভাগাভাগি করে থাকার ব্যবস্থা থাকছে না। ভাগাভাগি বলতে বাথরুম, কিচেন ভাগাভাগি বোঝাচ্ছে। অতঃপর? আমরা চেষ্টা করছি কিন্তু সবাই চিন্তিত। কারণ হোস্টেলে কেউ অসুস্থ হলে কী করে আলাদা রাখা হবে? কী করে চিকিৎসার ব্যবস্থা হবে? এসব প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। ভারতের বন্ধুটিকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমাদের কী অবস্থা? আমাদের প্রথমে কোনো চিন্তা ছিল না। আমরা ক্যাম্পাসে যেতাম। তবে ক্লাস চলত অনলাইনে। আমরা ব্যবহার করি গুগুলের মিট অ্যাপটি। তবে এতদিন আমরা প্রতিদিনই অফিসে যেতাম। তবে এখন অবস্থা খারাপ। বাসায়ই রয়েছি। নেপালের কী অবস্থা? আমরা তো রয়েছি কারফিউর মাঝে। মানে? মানে সকাল ৫টা থেকে ১০টা পর্যন্ত দোকানপাট খোলা, তবে হাঁটাপথ ছাড়া কেউ বের হতে পারছে না। বাকি সময় কারফিউ। সবকিছু চলছে বাড়ি থেকে। বুঝতেই পারছেন সারা পৃথিবীতে অবস্থা নিয়ন্ত্রণহীন। কী করা যায়, তা নিয়ে যতই অংক কষি না কেন, কী করা যায় তা নিয়ে সবাই চিন্তিত। এরই মাঝে আমার এক ভাগনি জানাল, তাদের স্কুল ক্লাস নাইনের ছাত্রদের ডেকেছে। কী কারণ? ক্লাস নাইনে বোর্ডের রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। বোর্ডের ফরম পূরণ করতে হবে। কী কাণ্ড! বোর্ড কি অনলাইনে ফরম দিতে পারেনি? কী জানি, তবে স্কুল জানিয়েছে যেতে। ক্লাস নাইনের ছাত্ররা যাবে। আচ্ছা! কিছুটা অবাক, কিছুটা চিন্তিত সবাই। কিন্তু কী করা যায়। হেডমাস্টার মনে করেন তার ছাত্রদের ফরম স্বহস্তে পূরণ করতে হলে স্কুলেই যেতে হবে। সবাই কি ঢাকায় আছে? না তা নয়। তবে? যারা ঢাকার বাইরে রয়েছে, তারাও আসবে ফরম পূরণ করতে। কয়েক দিন বাদে খবর পাওয়া গেল, ফরম পূরণ করতে মোট দুদিন যেতে হয়েছে স্কুলে। এই দুদিন তারা প্রচুর আনন্দ করেছে। বহুদিন পর বন্ধুদের পেয়েছে। তবে তার এখন জ্বর! কী বলো? মা-বাবার মাথায় বাড়ি! বাবার অফিস বন্ধ। মায়ের অবস্থা বুঝতেই পারছেন। একঘরে মেয়েকে কী করে আলাদা রাখা যায়? বাথরুমও আলাদা করতে হবে। এদিকে বাবার অফিসে প্রচুর কাজ। কিন্তু তাকেও থাকতে হবে আইসোলেশনে! কভিড টেস্ট করিয়েছ? না করাইনি, তবে হয়েছে। কী করে বুঝলে? জানাল ওর পাঁচ বান্ধবী দুদিন একসঙ্গেই ছিল। একজন এসেছে খুলনা থেকে। সে খুলনা যাওয়ার পথে বাসেই তার জ্বর এসেছে। পরীক্ষায় কভিড ধরা পড়েছে। অন্য আরো দুজনও জ্বরে ভুগছে। তারা পরীক্ষা করিয়েছে। তাদেরও নাকি কভিড পজিটিভ। বাকি রয়েছিল আমার ভাগনি ও অন্য একজন। ওরও জ্বর। সব লক্ষণই রয়েছে। তাই কভিড নয়তো কী? বললাম, পরীক্ষা করিয়ে নাও। বাসায় এসেও পরীক্ষা করা যায়। কী হবে পরীক্ষা করে। রোগ তো বোঝাই যাচ্ছে। তবুও! কয়েক দিন পর জানা গেল মায়েরও জ্বর। কী করা! রিলিফ অপারেশনে নামতে হচ্ছে। বুঝতেই পারছেন। একজনের অসুস্থতা আমাদের সমাজে কতজনকে ব্যস্ত করে তোলে! বললাম, তোমাদের বাসার পাশেই তো হাসপাতাল। যাও পরীক্ষা করাও। সম্ভব নয়! কী কারণ? ওখানে গেলে কভিড না হলেও লাইনে দাঁড়িয়েই নাকি কভিড হবে! আচ্ছা, তবে বাসায়ই করিয়ে নাও। বাসায় করোনা পরীক্ষার ফি শুনে আক্কেলগুড়ুম। প্রতিজনের জন্য ৪ হাজার ৫০০ টাকা। বাসায় চারজনের জন্য গুনতে হবে ১৮ হাজার টাকা! তার চেয়ে বুঝে-শুনে ওষুধ খাই! বোনের সঙ্গে কথা বললাম। আমি তো ওষুধ খাওয়া শুরু করে ফেলেছি! টেস্ট না করেই? শোনো, যত তাড়াতাড়ি ওষুধ ধরবে ততই ভালো। নচেৎ হাসপাতালে যেতে হবে শ্বাসকষ্ট শুরু হলে। তখন বাঁচার সম্ভাবনাই নেই। কী ওষুধ? আমার কাছে লিস্ট করা আছে। ঘটনাটা বলছি কারণ অপরিণামদর্শী শিক্ষা বোর্ড কিংবা প্রধান শিক্ষককে কী বলা যায় বলুন? আমাদের দেশে একজন অসুস্থ হলে কত জনের সাহায্য প্রয়োজন ভেবেছেন কি? এই তুলনায় শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীকে ধন্যবাদ দেয়া যায়। তাদের জ্ঞান বোর্ডের হর্তাকর্তাদের চেয়ে বেশি। তারা দুজনই বলেছেন, ছাত্রছাত্রীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি হয় এমন কাজ আমরা করব না। সবকিছু না বুঝে আমরা শিক্ষাঙ্গন খুলছি না। কিন্তু স্কুলটির প্রধানশিক্ষক বা ঢাকা বোর্ডের জ্ঞানে তা ধরেনি! তাই দেখবেন এসব সরকারি কর্মচারীর চেয়ে আমাদের রাজনীতিকরা অনেক বেশি সংবেদনশীল। অনেক বেশি জনদরদি। এর মধ্যেই বরিস জনসন সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করলেন, লন্ডনে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় খুলেছিল কিন্তু শিক্ষার্থীরা দূরত্ব পালন করেনি। রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। তাদের আবার বাড়তি চিন্তা। শিক্ষার্থীরা হোস্টেল থেকে বাসায় গেলে বাসায় তা ছড়াবে। তাই তার অনুরোধ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন চিকিৎসার দায়িত্ব নেয়। বুঝতেই পারছেন। অবস্থা কেমন। তিনি শিক্ষার্থীদের অনুরোধ করলেন, বাবারা মাস্ক পরো আর দূরত্ব বজায় রাখো। আমার মনে পড়ে গেল ভাগনিটির কথা। অসম্ভব ব্যাপার। শিশু-কিশোরদের দূরত্ব বজায় রাখার চিন্তা কি সম্ভব? কথা হচ্ছিল ব্যাংককের এআইটির এক অধ্যাপকের সঙ্গে। তিনি জানালেন, থাইল্যান্ড করোনাকে সামলে নিয়েছে। সেখানে রোগের প্রাদুর্ভাব কমেছে। সেখানে দিনে ১০ জনের নিচে রোগী ধরা পড়ছে গত মে মাস থেকে। তাই তারা খুলছে। তবে তাদের ইনস্টিটউটে বিদেশী ছাত্ররা এখনো অনলাইনে ক্লাস করছে। থাই ছাত্ররা ক্লাসরুমে  আসছে। তবে ইনস্টিটিউট ক্যাম্পাসে তৈরি করেছে পৃথক আবাসস্থল। যেখানে করোনা রোগী ধরা পড়লে থাকবে। সবই করতে হয়েছে তাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে। আমার সহধর্মিণীও শিক্ষক। তিনিও নিয়মিত জুমে ক্লাস নিচ্ছেন। তার ছাত্রদের বয়স চার-পাঁচ বছর হবে। বললাম, কী করে তোমরা অনলাইনে পড়াও? ওরা কি জানে কী করে কলম ধরতে হবে? ওদেরকে কলম ধরানোও শেখাতে হয়। হুম। সহজ না। কিন্তু মায়েরা পাশেই থাকে। তাদের সাহায্য করতে হয়। বুঝলাম কিন্তু যে মায়ের দুটি সন্তান দুটি ক্লাসে পড়ে? কিংবা যে বাসায় তিনটি ছাত্র, একসঙ্গে ক্লাসে অনলাইনে বসে কী করে? উত্তর নেই। কিংবা যদি মা-বাবা শিক্ষিত নন, তাদের অবস্থা কী? আমরা চেষ্টা করি বুঝিয়ে দিতে। আর কী করা যাবে। তবে মায়েরা বহু কষ্ট করছে। তারাও পড়ছে। সন্তানদের সঙ্গে। তবে আমরা চেষ্টা করি ক্লাসের সময় কমিয়ে দিতে। কারণ মোবাইল সবার নেই। সবাই একসঙ্গে পড়তে গেলে নীরব কক্ষ ঘরে থাকবে না। আবার সবাই ভিডিও ক্লাস করতে না-ও চাইতে পারে। কারণ বাসার অবস্থা বাকি সবাইকে জানান দেয়ার ইচ্ছা অনেকের নেই। বুঝতেই পারছেন। সারা বিশ্বে শিক্ষা ব্যবস্থা পার করছে একটি কঠিন সময়। এর মধ্যে দেখলাম আমাদের কোনো কোনো সহকর্মী অনলাইন পরীক্ষায় নকল নিয়ে অত্যন্ত চিন্তিত। ছাত্রছাত্রীদের ক্যামেরা খুলে রাখতে বলছেন। অনেকেই তা করতে চায় না। অনেকেই বাসায় আত্মীয়পরিজন নিয়ে বাস করে। সবাই কাজে ব্যস্ত। এ সময় ক্যামেরা অন করে ক্লাস করা বাধ্যতামূলক করাকে অনেকেই পছন্দ করে না। কারণ সবাই হয়তো ক্যামেরায় চেহারা দেখানোর অবস্থায় থাকে না। এক সহকর্মী তো বলেই বসলেন, কেন ওরা ক্যামেরা খুলে রাখতে পারবে না? কেন জিআরই পরীক্ষার সময় তো পারে! কী বলা যায় তাকে? আমাদের সব শিক্ষক শিক্ষকের যোগ্যতা যে রাখেন না, সব প্রধান শিক্ষক যে প্রধান শিক্ষকের উপযুক্ত নন, তারই প্রমাণ এসব ঘটনা। শিক্ষকতা কোনো চাকরি নয়, এটা যে একটি ব্রত, তা অনেকেই না বুঝে চাকরি করতে এসেছেন। তাদের নিয়েই যত বিপদ। মুদ্রার ওপিঠ রয়েছে। আমার এক ছাত্রী। তার তিন বছরের ছেলেকে নিয়ে বিপদে রয়েছে বলে জানাল। বলল, বয়স তিন তাই ওর সমবয়সীদের সঙ্গে না মিশলে হচ্ছে না। বাসায় থেকে যন্ত্রণা করছে। ছটফট করছে ঘরে বসে। কী করা যায় বুঝতে পারছি না। বললাম স্কুলে দিলেও বিপদ হতে পারে। শিশুদের অধিকাংশেরই কভিড উপসর্গ কম দেখা যায়। তারা সহজে কাশতেও পারে না। তাই তাদের কভিড হলে বিপদ বেশি। তাই সাবধান থাকতে হবে। স্কুল খুলে গেলে দেখবে এক শিশু তা ছড়াচ্ছে অন্য শিশুকে আর তা থেকে ছড়াবে বাসায় বাসায়। বাংলাদেশ উন্নত বিশ্ব নয় যে শিশুকে হাসপাতালে রেখে মা-বাবারা কাজে যেতে পারবেন। তখন শিশুসহ পরিবারের সবাই হয় অসুস্থ হবে নচেৎ চিকিৎসা-পরিচর্যায় ব্যস্ত হবে। কী পরিমাণ বিপদ হতে পারে তা কল্পনাও করা যায় না। মোদ্দাকথা, করোনায় সবচেয়ে বেশি বিপর্যয় হবে শিক্ষাঙ্গনে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায়। সব ক্ষেত্রে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি অনলাইন কার্যক্রমকে তৈরি করতে হবে শিক্ষকতার ব্রত দিয়ে। ব্যবস্থা হতে হবে মানবিক। প্রয়োজন পড়বে সহযোগিতা ও সহমর্মিতার। আশা করি সবাই ভাবছেন।   ড. এ. কে. এনামুল হক: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি ও পরিচালক, এশিয়ান সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট

স্ত্রীকে পুড়িয়ে হত্যার ১৪ বছর পর স্বামীর মৃত্যুদণ্ড

নিউজবাংলা ডেস্ক: যৌতুক না পেয়ে স্ত্রীকে পুড়িয়ে হত্যার দায়ে মোশারফ হোসেন নামে এক ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর)...

এমসি কলেজ কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা : জুডিশিয়াল তদন্তের নির্দেশ

নিউজবাংলা ডেস্ক: সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গৃহবধূ ধর্ষণের ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন ও কলেজ কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতার বিষয়ে জুডিশিয়াল তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন...

আসলেই কি সব হারিয়েছেন ভারতের শীর্ষ ধনী অনিল আম্বানি?

নিউজবাংলা ডেস্ক ভারতের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি মুকেশ আম্বানি। প্রায় ৬৪ বিলিয়ন বা ছয় হাজার ৪০০ কোটি ডলারের সম্পদ রয়েছে তার।...

নারীর সম্ভ্রম রক্ষায় প্রতীকী নামে রায় দিলেন বিচারক

নিউজবাংলা ডেস্ক: ভুক্তভোগী এক নারীর সম্ভ্রম রক্ষায় এবার যুগান্তকারী রায় ঘোষণা করেছেন মাগুরার মুখ্য বিচারিক হাকিম জিয়াউর রহমান। মামলার রায়ে...

অবিশ্বাস্য ম্যাচে রোহিতদের হারাল কোহলির বেঙ্গালুরু

নিউজবাংলা ডেস্ক: আইপিএলে এসব হচ্ছে কী! কাল শারজার ছোট মাঠে কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবের ২২৩ রান তাড়া করে জিতল রাজস্থান রয়েলস।...

Must read

কভিড-১৯, শিক্ষাঙ্গন ও শিক্ষকতা

ড. এ. কে. এনামুল হক বহুদিন ঘর থেকে বের হইনি। ভাবলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে দেখি কেমন আছে আমাদের ক্যাম্পাস। যখন পৌঁছলাম তখন বেলা ১টা হবে। পরিচিত কোনো কোলাহল নেই। শিক্ষার্থীবিহীন ক্যাম্পাস দেখতে ভুতুড়েই মনে হলো। ডিপার্টমেন্টে গিয়ে দেখতে পেলাম অফিসের লোকজন এসেছে। তারা পালাক্রমে আসে। যেন একসঙ্গে ভিড় না হয়। দূরত্ব বজায় থাকে। তারাই জানাল মাঝে মাঝে শিক্ষকরাও আসেন। যে যার মতো। কাজ করে চলে যান। বুঝতে পারলাম ক্যাম্পাসের মায়া না থাকলে শিক্ষক হওয়া যায় না। তাই সবাই কোনো না কোনো ছুতায় মাঝে মাঝেই আসেন। আমরা চারজন একটি বই লিখছি। প্রায় এক বছর হলো। চারজন চার দেশে থাকি। একজন থাকেন ওহাইওতে। সেখানে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। অন্যজন গোয়ায়। ভারতের গোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। অন্যজন নেপালে। হঠাৎ করেই স্প্রিংজার নেচার বইটি প্রকাশ করতে চুক্তিবদ্ধ হওয়ায় আমরা প্রতি সপ্তাহে অন্তত ঘণ্টাখানেক সময় জুম দিয়ে কথা বলি। তাই ভাবলাম, তারাও কি ক্যাম্পাসে যায়? জিজ্ঞেস করি। ওহাইওর অবারলিনের বন্ধুটিকে জিজ্ঞেস করলাম। ক্যাম্পাসে যাও? জানাল, সেও যায়। মাঝে মাঝেই। অবারলিন একটি ছোট শহর। তাই সেখানে খুব একটা লোকসমাগম নেই। ক্যাম্পাস বন্ধ। আমাদের মতোই তারাও অনলাইন ক্লাস করে। জুম অ্যাপটি ব্যবহার করে। ছাত্রছাত্রীরা ক্যাম্পাসে নেই। জানাল যে ক্যাম্পাসে তারা কারো সঙ্গে দেখা হলে দূর থেকেই হাত তোলে স্বাগত জানায়। ধারেকাছে কেউ ঘেঁষে না। কথা বলতে হলে ফোনে কথা বলে। যদিও তার সহকর্মীটি হয়তোবা পাশের কক্ষেই বসে আছে। ক্যাম্পাস খোলার কি লক্ষণ আছে? জানাল ছাত্রছাত্রীদের ভিসা সমস্যা সমাধানের জন্য তারা ক্যাম্পাসে ক্লাসের ব্যবস্থা নিচ্ছে। নচেৎ অনেকেরই যুক্তরাষ্ট্রে থাকার ভিসা রইবে না। কীভাবে করবে? প্রথমত, আমরা প্রত্যেক শিক্ষক, কর্মচারীদের প্রতি দুদিন অন্তর করে কভিড টেস্ট করাচ্ছি। দেখছি ক্যাম্পাসে কভিড রোগী রয়েছে কিনা। আমাদের পলিসি হলো, ক্যাম্পাসে কভিড পজিটিভ শূন্য হলে তবেই ক্যাম্পাস খুলবে। এখন পর্যন্ত তা হয়নি। সর্বশেষ দুজনকে পাওয়া গেছে। তবে ক্যাম্পাসে নতুন প্রোটোকল ঘোষণা হয়েছে। কী রকম? ক্যাম্পাসে আসা না-আসাটা ছাত্রদের নিজস্ব ব্যাপার। কারণ তাদের কভিড হলে বিপদ। দ্বিতীয়ত, বিভাগভেদে সপ্তাহে অন্তত একটি ক্লাস ক্যাম্পাসে নেয়ার চেষ্টা হবে। তাও হবে সীমিতসংখ্যক ছাত্রের উপস্থিতিতে। কারণ শিক্ষার্থীরা একত্রে হলেই জটলা করবে। তখন সারা ক্যাম্পাসে তা ছড়িয়ে পড়তে পারে। এটাই বিপদ। আবার যারা হোস্টেলে থাকবে তাদের প্রত্যেককে আলাদা রুমে রাখার চেষ্টা চলছে। ভাগাভাগি করে থাকার ব্যবস্থা থাকছে না। ভাগাভাগি বলতে বাথরুম, কিচেন ভাগাভাগি বোঝাচ্ছে। অতঃপর? আমরা চেষ্টা করছি কিন্তু সবাই চিন্তিত। কারণ হোস্টেলে কেউ অসুস্থ হলে কী করে আলাদা রাখা হবে? কী করে চিকিৎসার ব্যবস্থা হবে? এসব প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। ভারতের বন্ধুটিকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমাদের কী অবস্থা? আমাদের প্রথমে কোনো চিন্তা ছিল না। আমরা ক্যাম্পাসে যেতাম। তবে ক্লাস চলত অনলাইনে। আমরা ব্যবহার করি গুগুলের মিট অ্যাপটি। তবে এতদিন আমরা প্রতিদিনই অফিসে যেতাম। তবে এখন অবস্থা খারাপ। বাসায়ই রয়েছি। নেপালের কী অবস্থা? আমরা তো রয়েছি কারফিউর মাঝে। মানে? মানে সকাল ৫টা থেকে ১০টা পর্যন্ত দোকানপাট খোলা, তবে হাঁটাপথ ছাড়া কেউ বের হতে পারছে না। বাকি সময় কারফিউ। সবকিছু চলছে বাড়ি থেকে। বুঝতেই পারছেন সারা পৃথিবীতে অবস্থা নিয়ন্ত্রণহীন। কী করা যায়, তা নিয়ে যতই অংক কষি না কেন, কী করা যায় তা নিয়ে সবাই চিন্তিত। এরই মাঝে আমার এক ভাগনি জানাল, তাদের স্কুল ক্লাস নাইনের ছাত্রদের ডেকেছে। কী কারণ? ক্লাস নাইনে বোর্ডের রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। বোর্ডের ফরম পূরণ করতে হবে। কী কাণ্ড! বোর্ড কি অনলাইনে ফরম দিতে পারেনি? কী জানি, তবে স্কুল জানিয়েছে যেতে। ক্লাস নাইনের ছাত্ররা যাবে। আচ্ছা! কিছুটা অবাক, কিছুটা চিন্তিত সবাই। কিন্তু কী করা যায়। হেডমাস্টার মনে করেন তার ছাত্রদের ফরম স্বহস্তে পূরণ করতে হলে স্কুলেই যেতে হবে। সবাই কি ঢাকায় আছে? না তা নয়। তবে? যারা ঢাকার বাইরে রয়েছে, তারাও আসবে ফরম পূরণ করতে। কয়েক দিন বাদে খবর পাওয়া গেল, ফরম পূরণ করতে মোট দুদিন যেতে হয়েছে স্কুলে। এই দুদিন তারা প্রচুর আনন্দ করেছে। বহুদিন পর বন্ধুদের পেয়েছে। তবে তার এখন জ্বর! কী বলো? মা-বাবার মাথায় বাড়ি! বাবার অফিস বন্ধ। মায়ের অবস্থা বুঝতেই পারছেন। একঘরে মেয়েকে কী করে আলাদা রাখা যায়? বাথরুমও আলাদা করতে হবে। এদিকে বাবার অফিসে প্রচুর কাজ। কিন্তু তাকেও থাকতে হবে আইসোলেশনে! কভিড টেস্ট করিয়েছ? না করাইনি, তবে হয়েছে। কী করে বুঝলে? জানাল ওর পাঁচ বান্ধবী দুদিন একসঙ্গেই ছিল। একজন এসেছে খুলনা থেকে। সে খুলনা যাওয়ার পথে বাসেই তার জ্বর এসেছে। পরীক্ষায় কভিড ধরা পড়েছে। অন্য আরো দুজনও জ্বরে ভুগছে। তারা পরীক্ষা করিয়েছে। তাদেরও নাকি কভিড পজিটিভ। বাকি রয়েছিল আমার ভাগনি ও অন্য একজন। ওরও জ্বর। সব লক্ষণই রয়েছে। তাই কভিড নয়তো কী? বললাম, পরীক্ষা করিয়ে নাও। বাসায় এসেও পরীক্ষা করা যায়। কী হবে পরীক্ষা করে। রোগ তো বোঝাই যাচ্ছে। তবুও! কয়েক দিন পর জানা গেল মায়েরও জ্বর। কী করা! রিলিফ অপারেশনে নামতে হচ্ছে। বুঝতেই পারছেন। একজনের অসুস্থতা আমাদের সমাজে কতজনকে ব্যস্ত করে তোলে! বললাম, তোমাদের বাসার পাশেই তো হাসপাতাল। যাও পরীক্ষা করাও। সম্ভব নয়! কী কারণ? ওখানে গেলে কভিড না হলেও লাইনে দাঁড়িয়েই নাকি কভিড হবে! আচ্ছা, তবে বাসায়ই করিয়ে নাও। বাসায় করোনা পরীক্ষার ফি শুনে আক্কেলগুড়ুম। প্রতিজনের জন্য ৪ হাজার ৫০০ টাকা। বাসায় চারজনের জন্য গুনতে হবে ১৮ হাজার টাকা! তার চেয়ে বুঝে-শুনে ওষুধ খাই! বোনের সঙ্গে কথা বললাম। আমি তো ওষুধ খাওয়া শুরু করে ফেলেছি! টেস্ট না করেই? শোনো, যত তাড়াতাড়ি ওষুধ ধরবে ততই ভালো। নচেৎ হাসপাতালে যেতে হবে শ্বাসকষ্ট শুরু হলে। তখন বাঁচার সম্ভাবনাই নেই। কী ওষুধ? আমার কাছে লিস্ট করা আছে। ঘটনাটা বলছি কারণ অপরিণামদর্শী শিক্ষা বোর্ড কিংবা প্রধান শিক্ষককে কী বলা যায় বলুন? আমাদের দেশে একজন অসুস্থ হলে কত জনের সাহায্য প্রয়োজন ভেবেছেন কি? এই তুলনায় শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীকে ধন্যবাদ দেয়া যায়। তাদের জ্ঞান বোর্ডের হর্তাকর্তাদের চেয়ে বেশি। তারা দুজনই বলেছেন, ছাত্রছাত্রীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি হয় এমন কাজ আমরা করব না। সবকিছু না বুঝে আমরা শিক্ষাঙ্গন খুলছি না। কিন্তু স্কুলটির প্রধানশিক্ষক বা ঢাকা বোর্ডের জ্ঞানে তা ধরেনি! তাই দেখবেন এসব সরকারি কর্মচারীর চেয়ে আমাদের রাজনীতিকরা অনেক বেশি সংবেদনশীল। অনেক বেশি জনদরদি। এর মধ্যেই বরিস জনসন সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করলেন, লন্ডনে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় খুলেছিল কিন্তু শিক্ষার্থীরা দূরত্ব পালন করেনি। রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। তাদের আবার বাড়তি চিন্তা। শিক্ষার্থীরা হোস্টেল থেকে বাসায় গেলে বাসায় তা ছড়াবে। তাই তার অনুরোধ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন চিকিৎসার দায়িত্ব নেয়। বুঝতেই পারছেন। অবস্থা কেমন। তিনি শিক্ষার্থীদের অনুরোধ করলেন, বাবারা মাস্ক পরো আর দূরত্ব বজায় রাখো। আমার মনে পড়ে গেল ভাগনিটির কথা। অসম্ভব ব্যাপার। শিশু-কিশোরদের দূরত্ব বজায় রাখার চিন্তা কি সম্ভব? কথা হচ্ছিল ব্যাংককের এআইটির এক অধ্যাপকের সঙ্গে। তিনি জানালেন, থাইল্যান্ড করোনাকে সামলে নিয়েছে। সেখানে রোগের প্রাদুর্ভাব কমেছে। সেখানে দিনে ১০ জনের নিচে রোগী ধরা পড়ছে গত মে মাস থেকে। তাই তারা খুলছে। তবে তাদের ইনস্টিটউটে বিদেশী ছাত্ররা এখনো অনলাইনে ক্লাস করছে। থাই ছাত্ররা ক্লাসরুমে  আসছে। তবে ইনস্টিটিউট ক্যাম্পাসে তৈরি করেছে পৃথক আবাসস্থল। যেখানে করোনা রোগী ধরা পড়লে থাকবে। সবই করতে হয়েছে তাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে। আমার সহধর্মিণীও শিক্ষক। তিনিও নিয়মিত জুমে ক্লাস নিচ্ছেন। তার ছাত্রদের বয়স চার-পাঁচ বছর হবে। বললাম, কী করে তোমরা অনলাইনে পড়াও? ওরা কি জানে কী করে কলম ধরতে হবে? ওদেরকে কলম ধরানোও শেখাতে হয়। হুম। সহজ না। কিন্তু মায়েরা পাশেই থাকে। তাদের সাহায্য করতে হয়। বুঝলাম কিন্তু যে মায়ের দুটি সন্তান দুটি ক্লাসে পড়ে? কিংবা যে বাসায় তিনটি ছাত্র, একসঙ্গে ক্লাসে অনলাইনে বসে কী করে? উত্তর নেই। কিংবা যদি মা-বাবা শিক্ষিত নন, তাদের অবস্থা কী? আমরা চেষ্টা করি বুঝিয়ে দিতে। আর কী করা যাবে। তবে মায়েরা বহু কষ্ট করছে। তারাও পড়ছে। সন্তানদের সঙ্গে। তবে আমরা চেষ্টা করি ক্লাসের সময় কমিয়ে দিতে। কারণ মোবাইল সবার নেই। সবাই একসঙ্গে পড়তে গেলে নীরব কক্ষ ঘরে থাকবে না। আবার সবাই ভিডিও ক্লাস করতে না-ও চাইতে পারে। কারণ বাসার অবস্থা বাকি সবাইকে জানান দেয়ার ইচ্ছা অনেকের নেই। বুঝতেই পারছেন। সারা বিশ্বে শিক্ষা ব্যবস্থা পার করছে একটি কঠিন সময়। এর মধ্যে দেখলাম আমাদের কোনো কোনো সহকর্মী অনলাইন পরীক্ষায় নকল নিয়ে অত্যন্ত চিন্তিত। ছাত্রছাত্রীদের ক্যামেরা খুলে রাখতে বলছেন। অনেকেই তা করতে চায় না। অনেকেই বাসায় আত্মীয়পরিজন নিয়ে বাস করে। সবাই কাজে ব্যস্ত। এ সময় ক্যামেরা অন করে ক্লাস করা বাধ্যতামূলক করাকে অনেকেই পছন্দ করে না। কারণ সবাই হয়তো ক্যামেরায় চেহারা দেখানোর অবস্থায় থাকে না। এক সহকর্মী তো বলেই বসলেন, কেন ওরা ক্যামেরা খুলে রাখতে পারবে না? কেন জিআরই পরীক্ষার সময় তো পারে! কী বলা যায় তাকে? আমাদের সব শিক্ষক শিক্ষকের যোগ্যতা যে রাখেন না, সব প্রধান শিক্ষক যে প্রধান শিক্ষকের উপযুক্ত নন, তারই প্রমাণ এসব ঘটনা। শিক্ষকতা কোনো চাকরি নয়, এটা যে একটি ব্রত, তা অনেকেই না বুঝে চাকরি করতে এসেছেন। তাদের নিয়েই যত বিপদ। মুদ্রার ওপিঠ রয়েছে। আমার এক ছাত্রী। তার তিন বছরের ছেলেকে নিয়ে বিপদে রয়েছে বলে জানাল। বলল, বয়স তিন তাই ওর সমবয়সীদের সঙ্গে না মিশলে হচ্ছে না। বাসায় থেকে যন্ত্রণা করছে। ছটফট করছে ঘরে বসে। কী করা যায় বুঝতে পারছি না। বললাম স্কুলে দিলেও বিপদ হতে পারে। শিশুদের অধিকাংশেরই কভিড উপসর্গ কম দেখা যায়। তারা সহজে কাশতেও পারে না। তাই তাদের কভিড হলে বিপদ বেশি। তাই সাবধান থাকতে হবে। স্কুল খুলে গেলে দেখবে এক শিশু তা ছড়াচ্ছে অন্য শিশুকে আর তা থেকে ছড়াবে বাসায় বাসায়। বাংলাদেশ উন্নত বিশ্ব নয় যে শিশুকে হাসপাতালে রেখে মা-বাবারা কাজে যেতে পারবেন। তখন শিশুসহ পরিবারের সবাই হয় অসুস্থ হবে নচেৎ চিকিৎসা-পরিচর্যায় ব্যস্ত হবে। কী পরিমাণ বিপদ হতে পারে তা কল্পনাও করা যায় না। মোদ্দাকথা, করোনায় সবচেয়ে বেশি বিপর্যয় হবে শিক্ষাঙ্গনে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায়। সব ক্ষেত্রে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি অনলাইন কার্যক্রমকে তৈরি করতে হবে শিক্ষকতার ব্রত দিয়ে। ব্যবস্থা হতে হবে মানবিক। প্রয়োজন পড়বে সহযোগিতা ও সহমর্মিতার। আশা করি সবাই ভাবছেন।   ড. এ. কে. এনামুল হক: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি ও পরিচালক, এশিয়ান সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট

স্ত্রীকে পুড়িয়ে হত্যার ১৪ বছর পর স্বামীর মৃত্যুদণ্ড

নিউজবাংলা ডেস্ক: যৌতুক না পেয়ে স্ত্রীকে পুড়িয়ে হত্যার দায়ে মোশারফ...

আপনার পছন্দের সংবাদRELATED
Recommended to you