রুহুল ইসলাম টিপু

শ্রেয়া আমার বড় মেয়ে। আজ তাঁর জন্মদিন। শ্রেয়া জন্মদিন বুঝে না। ২৩ বছর পার হলো। শ্রেয়ার মানসিক বয়স কোনভাবেই ৫ বছরের বেশি হবে না। রাষ্ট্র এবং জাতিসংঘের নথির নিত্তিতে তাঁকে শিশুও বলা যাবে না। একজন পরিপূর্ণ মানুষ। ১৬ বছরে এসএসসি হলে। বিশ^বিদ্যালয়ের শেষের দিকে হয়ত শ্রেয়ার থাকার কথা। ছাত্রাবস্থায় বিয়ের কথা আমি ভাবার পক্ষপাতি নই। তাহলে চলে যেতো স্বনির্ভরতার দিকে। আমাকে তাক লাগিয়ে নিজেই আয়োজনে সামিল হতো জন্মদিনের। তারিখ ১৪ জুলাই। যার জন্ম ১৯৯৮ সালে। গত শতাব্দীর মানুষ। দাদার মৃত্যু হলো গত ডিসেম্বরে। এবারের জন্মদিনে দাদাকে আর পাওয়া গেল না। হয়ত দাদু আমার মা’য়ের সাথেও চলতো বিচিত্র আবেগ-বাস্তব মেশানো কথা ও ভঙ্গিমার বিনিময়। মা তিন বোন এবং আমাকে নিয়ে শ্রেয়াই হয়ে যেতো সংসারের প্রধানতম ব্যক্তি। শাসন এবং ভালোবাসা মিলে অপার মহিমায় নিমজ্জিত এক সুখী পরিবার। শ্রেয়া অটিজমে আক্রান্ত। এটি আমার এখন আর কোন দুঃখ বোধ নয়। সময়ই আমাকে শিখিয়েছে সীমাবদ্ধতাকে গ্রহণ করে আনন্দে লীন হতে। বাসায় চলছে নিরব আয়োজন শ্রেয়ার জন্মদিন ঘিরে।

একটি কেক। কয়েকটি মোমবাতি। ফেস বুকে ছবি পোষ্ট। কাগজে ছবি আঁকা। তাক লাগানো রঙিন ফটো লাগানো। ঘরের আলো হবে আরো উজ্জ্বল। শ্রেয়ার হাসি। হাত নেড়ে কথা বলার ভঙ্গিমা। চোখে মুখের দীপ্তি। বলে দেয় শ্রেয়া জন্মদিন বুঝে। তাঁকে আনন্দিত করে। ১৪ জুলাই পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট আমাদের পরিবারের নিকট বিশেষ একটি দিন। সব বছর দিবসটিকে একইভাবে সুখময় করে উদযাপিত করতে পারি এমনটি নয়। তবে আমাদের সকলের প্রচেষ্টায় দিবসটিকে ¤øান হতে দেই না।

শ্রেয়া’র কথা অনেকেই শুনতে চায়। অনেকেই শ্রেয়াকে দেখতে চায়। অনেকেই শ্রেয়াকে অসীম ভালোবাসায় সিক্ত করতে চায়। সহজাত প্রবৃদ্ধি মানুষ মানুষকে ভালোবাসেন। ভালোবাসা চিরন্তন। শ্রেয়া কি শুধুই কথা না বলা মানুষ। শ্রেয়া’র হাসি মোনালিসাকেও হার মানায়। বিশেষ করে আমার নিকট। শ্রেয়া যে এক রহস্যময়ী মানবী। আমার প্রিয় কন্যা। তাঁর ভুবন ডাঙ্গা হাসি। চোখের চাহনি। ফুটে উঠে পৃথিবীর তাবৎ সৌন্দর্য্য। সুন্দরের ছড়াছড়ি। শ্রেয়ার মূখমন্ডল শরীর। বাংলাদেশের মেয়ে শ্রেয়া। বাবা হিসেবে আমি তখন বেশ অহংকারি হয়ে উঠি। ২৩ বছরের শ্রেয়ার বাঙালী নারী হয়ে উঠা হয়ত হলো না। অনায়াসেই শাড়ীতে ছিল শ্রেয়া অতীব মানানসই। শরীরে জড়ানো লাল সবুজ রং। আমার বাংলাদেশ। এই আমার মা। শ্রেয়া’ই আমার মাতৃভূমি। আমার দেশ।

মস্তিষ্ক বা অজ্ঞাত ত্রæটি ঘটিয়ে দিলো আচরণগত সমস্যা। শ্রেয়া বুঝে না। আমি বুঝি না। আমরা জানি না। শ্রেয়া পারে না। আমরা পারি না। শিক্ষার কৌশলগুলো সার্বজনীন নয়। সমাজের ধিকৃত উপহাসগুলো পেয়ে থাকি আমরা। শ্রেয়া বলতে পারে না। আমরা বলতে পারি না। নিরব কান্না বাসা বাঁধে আমাদের বাড়িতে। রাষ্ট্র বিশ^ আমাদের লোভ দেখায়। এই তো অজ¯্র অধিকার শ্রেয়াদের। লিখিত পঠিত আলোচিত। আমরা ধরবো। শ্রেয়া’রা গ্রহণ করবে। তাঁদের শিক্ষা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন কি নেই সেখানে। সবই আছে এবং পাবে। ২৩ বছরে শ্রেয়ার জুটেছে একটি জন্ম সনদ। হয়ত আমি দায়ী। উদ্যোগী হই নি। কিছুই জোটে নি শ্রেয়ার তরে। শ্রেয়ারা অধিকার পায় না। রাষ্ট্র দেয় না। কারণ শ্রেয়ারা বলতে পারে না। দাবী আদায় করতে পারে না। তাঁদের বাবা-মাও অটিজম পরিবার। রাষ্ট্র থেকে অধিকার নিয়ে শ্রেয়াদের দিতে পারে না।

রাষ্ট্রের নাগরিক জানেন মৌলিক অধিকার। শ্রেয়া জানে না কিছুই। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইনের ধারা-৩ অনুযায়ী বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধিতাসহ মোট ১১ ধরণের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির তালিকা রয়েছে। এর ধরণগুলো হচ্ছে: অটিজম বা অটিজমস্পেক্ট্রাম ডিজঅর্ডারস, শারীরিক প্রতিবন্ধিতা, মানসিক অসুস্থতাজনিত প্রতিবন্ধিতা, দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা, বাকপ্রতিবন্ধিতা, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা, শ্রবণপ্রতিবন্ধিতা, শ্রবণ-দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা, সেরিব্রাল পালসি, ডাউন ডিনড্রোম এবং বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধিতা।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইনের ১৫ নং ধারা অনুযায়ী জাতীয় সমন্বয় কমিটি আইনে বর্ণিত ১১ ধরণের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সাথে নতুন ও ভিন্ন ধরণের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির ধরণ ঘোষণা করতে পারবেন। আইন নির্ধারিত তালিকা বহির্ভূত ধরণকেও আইনের আওতায় গ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছে। নির্ধারিত ১১ ধরণের প্রতিবন্ধিতাসহ যেকোন ধরণের প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অর্থ্যাৎ বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তি এ আইনের আওতাধীন অধিকার ও সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী।

জন্মদিনের আনন্দটুকু অধিকার পাওয়া না পাওয়ার সাথে আর মিলাতে চাই না। শ্রেয়া এসেছে আমাদের ঘরে। পৃথিবীর আলো বাতাস দেখে বুঝে উপভোগ করে যেভাবে মানুষ পৃথিবী থেকে বিদায় গ্রহণ করে। শ্রেয়াও হয়ত সেভাবে বিদায় নিবে। সাধারণ চাওয়া পাওয়া এরকম। আমি শ্রেয়ার বাবা। জন্মদিনে শ্রেয়া এবং শ্রেয়াদের জন্য স্বাভাবিক মৃত্যুর অধিকার বাস্তবায়নের ঐকান্তিক ইচ্ছাটুকু রেখে যেতে চাই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here